Categories
দেশ

ভারতবর্ষের কেরালার থেক্কুমবাগম গ্রামে প্রায় প্রতিটা ঘরে ঘরে একজন করে সরকারী চাকুরিজীবী।এর পিছনে যার অবদান তাঁকে শিক্ষাক দিবসে প্রণাম।

ওইটুকু একটা গ্রাম থেকে গত পঁচিশ বছর ধরে ৫০০০ এরও বেশি সরকারী চাকুরীজীবীর নাম উঠে আসায় সম্প্রতি নড়েচড়ে বসেছিলো রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার। আর তখনই প্রকাশ্যে উঠে আসে এক সামান্য বেতনের মাঝবয়সী অ্যাসিস্ট্যান্ট সেকশন অফিসারের নাম।

আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে পড়াশোনায় ভালো রেজাল্ট না হওয়ায় বাবার তীব্র ভৎসনা শুনে, ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছিলো ছেলেটা। আত্মহত্যা করতে গিয়েও মায়ের মুখ‌ মনে পড়ায় দাদু-দিদার বাড়িতে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছিলো সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যতদিন না ভালো চাকরি পাবেন, ফিরবেন না নিজের গ্রামে। এরপর দাদুর উপদেশ শুনে খুব অল্প বয়স থেকেই সরকারি চাকরির জন্য পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। এর ফলে ১৯৯৫ সালে অল্প বয়সেই তিরুবন্তপুরমের সরকারি লাইব্রেরিতে পেয়ে যান সরকারি ক্লার্কের চাকরি।

ফিরে আসেন গ্রামে। আর গ্রামে ফেরার পরই জীবন বদলে যায় ওনার। ছেলেটাকে অত অল্পবয়সে চাকরি পেতে দেখে, তার দুই বন্ধু এসে ছেলেটার কাছে আর্জি জানান তাদের চাকরির পরীক্ষার বিষয়ে পড়ানোর জন্য। আশ্চর্যজনকভাবে ওনার কাছে পড়ে মাত্র একবছরের মধ্যেই তারা দু-জনই ভালো পোস্টে সরকারি চাকরি পেয়ে যায়।

এরপর বাকি কথাটা আসুন শুনে নেওয়া যাক ছেলেটার মুখ থেকেই- “ওই দুই বন্ধু চাকরি পাওয়ার পর, একদিন অফিস থেকে ফেরার সময় দেখি আমার বাড়ির সামনে প্রায় ৫০-৬০ জন কমবয়সী ছেলেমেয়ের ভিড়। অত লোকজনকে ওভাবে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে প্রথমে তো ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। তারপর যখন জানতে পারলাম ওরা প্রত্যেকে আমার কাছে পড়তে চায়, আনন্দে কান্না পেয়ে গেছিলো আমার। তবে সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ওদের পড়ানোর বিনিময়ে একটা টাকাও কখনও নেবো না আমি।”

ওই শুরু। এর বছরখানেকের মধ্যেই সেই ৫০-৬০ জনের সংখ্যাটা ১৫০ ছাড়িয়ে যায়। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে রাত ৮.৩০ থেকে ছেলেটা শুরু করে “ফ্রি কোচিং ক্লাস”। কয়েকবছরের মধ্যেই ওনার কাছে পড়া প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীই ঠিক কোনও না কোনও সরকারি চাকরি পেতে শুরু করেন। ছেলেটার কাছে অফার আসে মোটা টাকার বিনিময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর। কিন্তু তিনি এক মুহূর্ত না ভেবে তা নাকচ করে দেন।

গত ২৫ বছর ধরে ৫০০০ এর উপর “পাবলিক সারভেন্ট” তিনি উপহার দিয়েছেন এই দেশকে। কিন্তু বিনিময়ে সেই সব ছেলেমেয়েদের থেকে কখনও কোনওরকম আর্থিক সুবিধা নেননি তিনি। শুধু নীরবে কুড়িয়ে নিয়েছেন সেই সব ছেলেমেয়েদের মা বাবার আশীর্বাদ। এবছরও ওনার কাছে ৪০০ জন ছাত্র ছাত্রী প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারি চাকরি পরীক্ষার জন্য।

কেরালাসহ গোটা ভারতবর্ষ তাকে মধুস্যার নামে চিনলেও ভদ্রলোকের ভালো নাম মুরালি কৃষ্ণণ। একসময়ে মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া ছেলেটাই আজ হাজার হাজার সরকারি চাকুরীজীবীর মাথায় ছাদ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষক। না! এখনও অবধি কোনও বলিউডি সিনেমা হয়নি ওঁকে নিয়ে। আর তার দরকারও নেই। আসলে সব সুপারহিরোর রূপোলি পর্দার প্রয়োজন পড়ে না!